বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১১

বাঘার অন্যতম ঐতিহ্য শাহী দিঘি

বাঘা নিউজ ডটকম, বিশেষ প্রতিবেদন : বঙ্গ সংস্কৃতির হাজার ঐতিহ্যের মধ্যে অন্যতম হলো আওলিয়া দরবেশদের খানকা ভিত্তিক গড়ে উঠা নানান প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে বাঘার শাহী দিঘি অন্যতম। ইতিহাস প্রমান দেয়, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য বাগদাদিপীর হযরত শাহদৌলার দরগা শরিফ। যার উপলক্ষে গড়ে উঠা কারুকাজ খচিত মসজিদ ও মিষ্টি পানি পূর্ণ সু-বিশাল দিঘি অন্যতম। এই বাঘা থেকেই শুরু হয়েছিল উত্তর বঙ্গে ইসলাম প্রচার। ফলে বাঘাকে বলা হয় উত্তর বঙ্গের ইসলাম প্রচারের দ্বার। বাঘার এই সমস্ত ঐতিহ্য ও খ্যাতি দেশে-দেশে ছড়িয়ে পড়ে তৎকালিন সময়। তারই প্রেক্ষাপটে বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিনের ছেলে নাশির উদ্দিন ওরফে নুসরত শাহ বাঘায় আসেন এই সব ঘটনা ও ঐতিহ্য অবলোকন করতে। তিনি স্ব-চোক্ষে দেখেন বাঘার ওলি আওলিয়াদের ইসলাম ধর্ম প্রচার কল্পে একনিষ্ঠ ভুমিকা। যা দেখে তিনি মুগ্ধ হন। ফলে তিনি এই সমস্ত দীনই কর্মকান্ডের বিস্তার ঘটনানোর লক্ষে ৯ শ ৩০ হিজরী মোতাবেক ১৫২৩/২৪ খ্রিঃ আওলিয়াগণের স্বজন্যে নির্মান করেন কারুকার্য খচিত শাহী মসজিদ ও বিশাল শাহী দিঘি। যার বয়স বর্তমানে প্রায় ৫ শত বছর। এই দিঘির আয়তন ১৭ একর।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে এই দিঘিকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে কতো না অ-লৌকিক কাহিনী এবং কিংবদন্তী। এই দিঘির অমল ধবল স্বচ্ছ পানির আকর্ষনে শীতকালে সুদুর সাইবেরিয়া থেকে ছুটে আসে অতিথী পাখি। আর তারই আকর্ষনে প্রতিশীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন ভ্রমন পিপাসু আবাল বৃদ্ধ বনিতা। আশিতি পর বৃদ্ধ মহাম্মাদ আলী বলেন, আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর পুর্বে একজন শিকারী সখ করে দিঘিতে বসা পাখিকে গুলি করেছিল। এই গুলিতে আহত একটি পাখি দিঘির জলে ভাসলে ঐ পাকি উঠাতে তিনি দিঘির জলে নামেন । কিন্তু পরক্ষনে আর কিছুতেই জল থেকে উঠতে পারছিল না। এক পর্যায় তার  সফরসঙ্গী মাজারে গিয়ে হাজত মানত সহ অনেক প্রার্থনার পর তবেই ঐ শিকারি দিঘির মধ্য থেকে উপরে আসতে পারেন। এই ঘটনার শোনার পর  আর কখনো কেইউ পাখি শিকার করেননি।
 মাজারের মতোয়াল্লী খন্দকার মোনসুরুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৪ সালে স্থানীয় সরকার  প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে এটি পূণঃখনন করানো হয়। এ সময় দিঘির চোতুর পাড় দিয়ে লাগানো হয় সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ। পরবর্তী সময়ে বাঘা পৌর সভার মাধ্যমে মাজার ঘেষে তৈরী করা হয় একটি বিশাল সান বাধায় ঘাট। ফলে ঐ ঘাট-সহ চার পার্শ্বের সোন্দর্য আরো বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে দিঘির চোতুর পার্শ্বের সারি বদ্ধ বৃক্ষ রাজি বেষ্ঠিত মনরোম পরিবেশ এবং দেশজ পাক পাকালী ভ্রমন আর্থীদের নয়ন তৃপ্ত করে থাকে। অনেক সময় দিঘির স্বচ্ছ পানি ও অতিথী পাখিরা দলবেধে উড়ে-উড়ে দর্শনার্থীদের হাতছানী দিয়ে ডাকে দিঘির জলকে স্বর্শ করার জন্য। এখানেই শেষ নয়, আজ থেকে ৫ শত বছর ধরে বাঘার আরেক ঐতিহ্য রমজানের ঈদ মেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করেও দিঘির সৌন্দর্য বৃদ্দি পায়। ঐ সময় শত-শত নারী পুরুষ দিঘিতে গোসল করতে আসেন নিজেকে পাপ মৌচন সহ মন বাসনা পূর্ণের  জন্য । কথিত আছে, বন্ধ্যা মেয়েরা দিঘিতে গোসল এবং ওজু  করে পবিত্র মনে সন্তান কামনার উদ্দেশ্যে দু’রাকাত নফল নামাজ ও আদায় করলে তাদের মনো বাসনা পূর্ণ হয়। এ জন্য দুর দুরান্ত থেকে সে সময় দিঘিতে অনেক মেয়ে মানুষের আগমন ঘটে।

এই মাজার কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দেওয়ান আব্দুস সামাদ জানান, গত কয়েক বছর ধরে বাঘার মাজার ও দিঘির উন্নয়ন কল্পে সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। মাজার পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তে কখনো এই মাছ ডাকে আবার কখনো বা সৌখিন মৎস্য শিকারিদের নিকট টিকিট এর মাধ্যমে বিক্রী করা হচ্ছে। এ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার মাছ বিক্রী হয়। যা দিয়ে উন্নয়ন করা হচ্ছে  মাজার এলাকায়। লক্ষনীয়, এই মাছ ধরার সময় হাজার হাজার দর্শনার্থী দিঘির চার পার্শ্বে দাড়িয়ে মাছ ধরা দেখে। যা প্রচার করে থাকে বিটিভি সহ বিভিন্ন ইলেকট্রিক মিডিয়াগুলো। 

এক কথায় বাঘা যেমন উত্তরাঞ্চলের ইসলাম প্রচারের দ্বার কেন্দ্র , তেমনি এই অঞ্চলের প্রাচীন নগরীও বটে। এখান থেকে প্রায় ৫ শত বছর ধরে দিঘি সহ নানা ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের মাঝে যে প্রেমের সু-মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে তা-অমর কীর্তি গাথা। ফলে কেউ স্বচোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না বাঘার ইতিহাস এবং ঐতিহ্য কতো বড় !  #
Ruby